অগ্রিম আয়কর নিয়ে বিভ্রান্তি: রোড ট্যাক্সের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী করবর্ষ থেকে মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা হবে।

মোটরসাইকেলের ওপর প্রস্তাবিত অগ্রিম আয়কর নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই এই করকে “রোড ট্যাক্স” বা “ট্যাক্স টোকেন” এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। বাস্তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি হলো যানবাহন সড়কে চালানোর জন্য নির্ধারিত ফি, অন্যটি আয়কর আইনের আওতায় অগ্রিম কর পরিশোধের অংশ। তাই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী করবর্ষ থেকে মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা হবে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী:

১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলে কোনো অগ্রিম কর নেই
১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত ২ হাজার টাকা
১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা
১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কর “রোড ট্যাক্স” নয়। বর্তমানে মোটরযান নিবন্ধন ও ট্যাক্স টোকেন নবায়নের সময় যে অর্থ নেওয়া হয়, সেটি মূলত সড়ক ব্যবহার ও যানবাহন পরিচালনার প্রশাসনিক ফি। অন্যদিকে অগ্রিম আয়কর হচ্ছে ভবিষ্যৎ আয়করের একটি অংশ, যা আগেই পরিশোধ করা হয় এবং পরে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সমন্বয় করা যায়।

বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় অগ্রিম কর নতুন কোনো ধারণা নয়। ব্যাংক সুদ, জমি রেজিস্ট্রি, গাড়ি নিবন্ধন, আমদানি কিংবা বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রেও অগ্রিম কর বা উৎসে কর কেটে রাখা হয়। করদাতা ব্যক্তি বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এসব কর সমন্বয়ের সুযোগ পান।

তবে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে এসেছে। যেসব ব্যক্তির করযোগ্য আয় রয়েছে এবং নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তাদের জন্য এই অগ্রিম কর শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত বোঝা নাও হতে পারে। কারণ তারা পরবর্তীতে এটি সমন্বয় করতে পারবেন।

কিন্তু দেশের বড় একটি অংশ এখনো আয়কর নেটের বাইরে। অনেক শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের চাকরিজীবী, ডেলিভারি রাইডার, ফ্রিল্যান্সার বা ছোট উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, অথচ তাদের করযোগ্য আয় নেই। এই শ্রেণির মানুষের জন্য অগ্রিম কর বাস্তবে চূড়ান্ত করের মতো হয়ে যেতে পারে, কারণ তাদের কর সমন্বয়ের সুযোগ সীমিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে মোটরসাইকেল খাতে বাজার সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের ওপর ১০ হাজার টাকা কর আরোপ হলে উচ্চ সিসির বাইকের বিক্রি কমে যেতে পারে। এতে শোরুম ব্যবসায়ী, ডিলার, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীসহ পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু ব্যক্তিগত শখের বাহন নয়, বরং অনেকের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। রাইড শেয়ারিং, কুরিয়ার, ই-কমার্স ডেলিভারি ও গ্রামীণ যাতায়াতে মোটরসাইকেলের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন কর আরোপের ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছেন, সরকার রাজস্ব বাড়ানোর জন্য নতুন কর আরোপ করতেই পারে। তবে কর ব্যবস্থাকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে করদাতার সক্ষমতা, আয় ও বাস্তব ব্যবহার বিবেচনায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে অগ্রিম কর পরিশোধকারীদের জন্য সহজ সমন্বয় ও ফেরত ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!