হরিরামপুরে দেড় বছরে একাধিক সহিংসতা, নেপথ্যে একই বলয়

আমি একজন মাটি ব্যবসায়ী। কারও না কারও সাথে আমাকে ব্যবসা করতে হয়। এখন আমি শাহীন ভাইয়ের সাথে থেকে ব্যবসা করছি। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগছে তারাই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা করেছেন।

মানিকগঞ্জের পদ্মাপাড়ের উপজেলা হরিরামপুরে গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা, হামলা, মারধর, ভাঙচুর, বিচার-সালিশে প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় বারবার উঠে এসেছে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আবু সাদাত শাহীন ওরফে মোল্লা শাহীন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নাম।

স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক কর্মী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোল্লা শাহীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয়ের কারণে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা ও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে।

তাদের দাবি, হরিরামপুরে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অধিকাংশ আলোচিত সহিংস ঘটনার নেপথ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাহীনের অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কাইয়ুম মোল্লাসহ কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন ঘটনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার কয়েকটি থানায় অভিযোগ এবং একাধিক মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে।

সম্প্রতি বিচার-সালিশকে কেন্দ্র করে উপজেলার চালা ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা যুবদল সদস্য কাজী সালাউদ্দিন শিমুলকে মারধরের অভিযোগ ওঠে শাহীন, কাইয়ুম মোল্লা ও মুকুলসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।

জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা কাজী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তার ছেলে শিমুল হরিরামপুর উপজেলা যুবদলের সদস্য।

তিনি আরও জানান, ‘গত ৩ জুন দুপুরে চালা ইউনিয়ন পরিষদে একটি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসী আলোচনা করছিলেন। বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে তার ছেলে শিমুলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় মোল্লা শাহীন, কাইয়ুম, মুকুলসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে কাইয়ুম ও মুকুল সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। শিমুল পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, শাহীন নিজেও যুবদলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও দলের নেতাকর্মীদের হুমকি ও নির্যাতনের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।’

এ ঘটনায় ৫ জুন শিমুল বাদী হয়ে শাহীন, কাইয়ুম, মুকুলসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে হরিরামপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে, ৩ জুন রাতে আন্ধারমানিক এলাকায় শাহীনের ব্যক্তিগত অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন সংক্ষুদ্ধরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, শাহীনের আচরণে তার নিজ দলের নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ। তার নির্দেশের বাইরে গেলেই ভয়ভীতি, হামলা কিংবা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যক্তি।

কাইয়ূম মোল্লার মারধরের শিকার সোহান

উপজেলা যুবদলের সদস্য কাজী সালাউদ্দিন শিমুল বলেন, ‘মোল্লা শাহীন নিজের প্রভাববলয় শক্তিশালী করতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নিজ দলের নেতাকর্মীদের ওপরও বিভিন্ন ধরনের চাপ, হুমকি ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘শাহীন হরিরামপুর উপজেলা অশান্ত করার জন্য করা যখন যাকে মারধর বা অপদস্ত করা প্রয়োজন তাকেই সে তার বাহিনী দিয়ে হামলা করাচ্ছেন। এজন্য সে তার শক্তি বাড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করছেন। তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাইয়ুম উপজেলার বয়রা ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।’

এদিকে, বলড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও হরিরামপুর উপজেলা বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারেকও শাহীনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোরবানির ঈদের পরদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোল্লা শাহীনের নেতৃত্বে কাইয়ুম, দিয়াবাড়ীর শারুখসহ কয়েকজন যুবক তার বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙচুর করে এবং সেখানে থাকা তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। তিনি ঘটনাটিকে অত্যন্ত ন্যক্কার ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে বিষয়ে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করেছেন।’

এর আগে, বয়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুর রহমান তুষারকে রাজনৈতিক কোন্দলে রাস্তায় কুপিয়ে গুরুতর আহত করে শাহীন ও তার সহযোগীরা। ঘটনার পর তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ ঘটনায় আদালতে একটি মামলা চলমান আছে বলে জানিয়েছেন তুষার।

শাহীন মোল্লার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কাইয়ুম মোল্লার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

চালা ইউনিয়নের আগ্রাইল-দরিকান্দী গ্রামের বাসিন্দা চায়না বেগম বলেন, ‘২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর বিকেলে আমার ১০ম শ্রেনীতে পড়ুয়া ছেলে সোহান যাত্রাপুর ব্রিজ এলাকায় ঘুরতে গেলে কাইয়ুম মোল্লার ছেলের সাথে আমার ছেলের কথা কাটিকাটি হয়। পরে কাইয়ুম, তার ছেলে ও সহযোগীরা তাকে লোহার রড, হাতুড়ি ও সাইকেলের চেইন দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন।’

গুরুতর আহত অবস্থায় সোহানকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমদিকে পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করলেও অভিযুক্তদের ভয়ে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন তিনি। পরে একই ঘটনার জেরে ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর সোহানের ফুফু রলি হরিরামপুর থানায় কাইয়ুম মোল্লাসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

একই ইউনিয়নের দড়িকান্দি রাজরা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন পাইকারী ওষুধ বিক্রেতা। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে কাইয়ুম, শাহরুখসহ ১৫-২০ জন আমার দোকানে প্রবেশ করে লোহার রড, লাঠি, হাতুড়ি, হকিস্টিক দিয়ে বেড়ধক মারধর করে। পরে আমার দোকানের ক্যাশবাক্স থেকে ৯০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। আমার স্ত্রী আগিয়ে আসলেও তাকেও মারধর করে। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে পাঠায়। এ ঘটনায় আদালতে মামলা চলমান আছে।’

এ বিষয়ে মো. কাইয়ুম মোল্লা বলেন, ‘আমি একজন মাটি ব্যবসায়ী। কারও না কারও সাথে আমাকে ব্যবসা করতে হয়। এখন আমি শাহীন ভাইয়ের সাথে থেকে ব্যবসা করছি। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগছে তারাই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা করেছেন। আপনি তো ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি? – এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে আগে থেকেই জড়িত।

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মোল্লা শাহীন বলেন, ‘মূলত আমার ব্যাপারে যে অভিযোগ গুলো আনা হয়েছে তার সাথে আমি জড়িত না। আর কাইয়ুম একজন ড্রেজার ব্যবসায়ী। তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। একটি মহল নিজেরা মারামারি করে আমার নামে অপপ্রচার করছে। আমার নামে সম্প্রতি যে মামলা হয়েছে সেটা রাজনৈতিক মামলা।’

ওষুধ ব্যবসায়ী সাইফুলকে মারধরসহ দোকান ভাঙচুর করেন কাইয়ুম, শাহরুখসহ ১৫-২০ জন

জেলা যুবদলের সদস্য সচিব তুহিনুর রহমান তুহিন বলেন, ‘মানিকগঞ্জ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এলাকা। আমরা সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে আছি। হরিরামপুরে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটছে, সেসব বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এগোচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষকে যারা নির্যাতন করছে, তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’

হরিরামপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন বলেন, `আমি অল্প কয়েকদিন ধরে এসেছি। সম্প্রতি শিমুলকে মারধরের ঘটনায় একটা মামলা হয়েছে। মামলার অধিকাংশ আসামী পলাতক। আর কিছু ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগীরা কোন অভিযোগ দেয়নি। আর যেখানেই কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, পুলিশ দ্রুত সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ‘হরিরামপুর তথা মানিকগঞ্জে যেখানেই কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, পুলিশ দ্রুত সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনছে। হরিরামপুরে মাদক, কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক সহিংসতা নির্মূলে পুলিশ কাজ করছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের দ্রুত পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সংঘটিত বিভিন্ন হামলা, মারধর, ভাঙচুর ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় একই ব্যক্তিদের নাম বারবার উঠে আসায় হরিরামপুরে দলীয় কোন্দল ও উদ্বেগ বাড়ছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনীভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!