দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প/ আশ্রয়ণের ঘরে কষ্টের বসবাস

প্রকল্পের ঘরগুলোর দুরবস্থার বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। সংস্কারের আশ্বাসও পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

২৫ বছর ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়নের দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১০০টি পরিবার। সময়ের সঙ্গে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ঘরগুলো। বৃষ্টি হলেই টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ঘরে। ভাঙা বেড়া, নড়বড়ে খুঁটি, নষ্ট দরজা-জানালা আর জরাজীর্ণ টয়লেট-গোসলখানা নিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন এখানকার মানুষ।

অধিকাংশ ঘরের খুঁটি ভেঙে বেরিয়ে এসেছে রড। কোথাও টিনের চাল এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের মেঝেতে পানি জমে যায়। পানি ঠেকাতে বাসিন্দাদের ভরসা এখন পলিথিন। তাতেও কাজ না হলে বালতি কিংবা জগ দিয়ে রাতভর পানি সরাতে হয়।

দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী অসহায় ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই যাদের হিমশিম খেতে হয়, তাদের পক্ষে নিজেদের অর্থে বসতঘর মেরামত করা প্রায় অসম্ভব। ফলে বছরের পর বছর একই ভাঙাচোরা ঘরেই দিন কাটছে তাদের।

এই প্রকল্পেই বসবাস করেন আয়েশা বেগম। ১১ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যায়। এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। সংসারে নাবালক ছেলে আছে। তাই শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও ঘরের বারান্দায় ছোট একটি দোকান চালিয়ে কোনো রকমে সংসার টেনে নিচ্ছেন তিনি।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার কষ্ট শুরু। কয়েক মাস পর আমি স্ট্রোক করি। এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না। তাই ৫০০/১০০০ টাকা দিয়ে ঘরের বারান্দায় ছোট একটা দোকান দিয়েছি। দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাই। একবেলা খাবার জুটলে অন্যবেলা খেতে কষ্ট হয়ে যায়।’

ঘরের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে আয়েশা বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। পলিথিন টানিয়েও পানি আটকানো যায় না। ঘরের খুঁটি ভেঙে রড বের হয়ে গেছে। এই ঘরে থাকতে ভয় লাগে।’

আয়েশার মতোই প্রকল্পের অন্য বাসিন্দাদেরও প্রতিদিনের বাস্তবতা ভাঙা ঘর আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস। কারও ঘরের চাল ফুটো হয়ে গেছে, কারও দেয়াল বা বেড়া নষ্ট। আবার কোথাও দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় টয়লেট ও গোসলখানা হয়ে পড়েছে ব্যবহারের অনুপযোগী।

আরেক বাসিন্দা রাফিজা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে ১৩ বছর আগে। ছেলে নিজের সংসার চালাতে পারে না। আমাদের ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। পলিথিন টানিয়েও পানি আটকানো যায় না। ঘরের খুঁটি ভেঙে রড বের হয়ে গেছে। কখন কী হয়, সেই ভয় থাকে।’

মনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, ঘরের পাশাপাশি প্রকল্পের মৌলিক সুবিধাগুলোরও অবস্থা খারাপ। তিনি বলেন, ‘ঘরের অবস্থা তো যাতা। টয়লেট নষ্ট, টিউবওয়েল নষ্ট। এত বছর ধরে কষ্ট করছি। আমরা গরিব মানুষ। নিজেদের টাকা দিয়ে ঘর ঠিক করার সামর্থ্য নেই। সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলে আমাদের কষ্টটা কমত।’

কাজল বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী একাই আয় করে। সেই টাকা দিয়ে সংসারের সব খরচ চালাতে হয়। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাব, নাকি ঘর মেরামত করব? বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। তখন মনে হয়, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।’

দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছেন রেখা আক্তারও। তিনি বলেন, ‘দুই যুগ ধরে এখানে আছি। স্বামী আর দুই ছেলে নিয়ে সংসার। এত বছর হয়ে গেল, ঘরের অবস্থা ভালো হয়নি। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তখন থাকা যায় না। আমরা চাই, সরকার আমাদের ঘরগুলো একটু ঠিক করে দিক।’

প্রকল্পের বাসিন্দা মোস্তফা মিয়ার দাবি, ১০০টি ঘরের কমবেশি একই অবস্থা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ১০০ ঘরের অবস্থাই এখন বেহাল। টিনের চালে একাধিক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। আমাদের আয়-রোজগার ভালো থাকলে কারও কাছে সাহায্য চাইতাম না। সরকার যদি দ্রুত ঘরগুলো মেরামত করে দিত, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হতো।’

বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্পের ঘরগুলোর দুরবস্থার বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। সংস্কারের আশ্বাসও পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

প্রায় ২৫ বছর আগে ভূমিহীন, বিধবা ও অসহায় মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছিল দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প। তখন নতুন ঘরগুলো তাদের কাছে ছিল নিরাপদ জীবনের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই ঘরগুলোই এখন অনেকের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘পুরো প্রকল্প সংস্কারের বিষয়টি সরকারের নীতিমালার আওতাভুক্ত। সরকার নতুন করে প্রকল্পটি গুছিয়ে নেওয়া বা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলে জেলা প্রশাসন তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি কোনো বাসিন্দা ব্যক্তিগতভাবে ঘর সংস্কারের জন্য আবেদন করলে প্রশাসন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা করবে।’

দুই যুগের বেশি সময় ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় থাকা দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের এখন একটাই প্রত্যাশা, জরাজীর্ণ ঘরগুলো দ্রুত মেরামত করা হোক।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!