দৌলতপুরে নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে মাদ্রাসা

যমুনার অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। দ্রুত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ, স্থায়ী নদীশাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দৌলতপুরের এই জনপদে সংকট আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

তিন দফা নদীভাঙনে সব হারিয়েও হাল ছাড়েননি শান্তি বেগম। প্রায় ২০ বছর আগে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ব্রাহ্মন্দী গ্রামে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট একটি বসতভিটা। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে সেই ভিটাতেই কষ্টের সংসার চলছিল। কিন্তু রোববার গভীর রাতে যমুনার আগ্রাসী স্রোত মুহূর্তের মধ্যে গিলে নেয় তার জীবনের শেষ সম্বলটুকুও।

এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই ৭০ ঊর্ধ্ব এই বৃদ্ধার। খোলা আকাশের নিচে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘জীবনে তিনবার নদী আমার ঘর নিয়েছে। ভাবছিলাম আর হয়তো ভাঙবে না। কিন্তু এবার শেষ সম্বলটাও চলে গেল। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে বাঁচব কিছুই জানি না। হাতে খাবার, টাকা পয়সা কিছুই নাই।’

শুধু শান্তি বেগম নন, যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর তীরজুড়ে আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব। কোথাও মানুষ ভাঙনের আগে ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, কোথাও আবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো বসতভিটাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ভাঙনে শতাধিক বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। নদী প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ব্রাহ্মন্দী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যমুনার ভয়াল থাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা। নদী থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে অবস্থান করছে চারতলা একাডেমিক ভবন। ইতোমধ্যে মাদ্রাসার সীমানাপ্রাচীর ও টয়লেট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাদ্রাসার দুটি ভবন যে কোনো সময় নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

মাদ্রাসাটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, ওই চরাঞ্চলের শিক্ষার একমাত্র ভরসা। আশপাশে কোনো উচ্চবিদ্যালয় না থাকায় কয়েকটি গ্রামের শত শত শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করে।

স্থানীয় বাসিন্দা চাঁন মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আর কোনো হাইস্কুল নেই। এই মাদ্রাসাটা নদীতে চলে গেলে শত শত ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। তিন-চার কিলোমিটার দূরে একটি স্কুল আছে, সেখানে যেতে নদীপথ ছাড়া উপায় নেই। এত দূরে সন্তানদের পাঠানোর সামর্থ্যও অনেক পরিবারের নেই। তাই সরকার যেন দ্রুত মাদ্রাসাটি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।’

মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। সে বলে, ‘এই মাদ্রাসাটা যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে আমাদের আর পড়াশোনা হবে না। এত দূরে গিয়ে পড়ার সুযোগ আমাদের নেই। আমরা খুব ভয় আর দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যমুনায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এখানে আগে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু কাটা হয়েছে। আমরা প্রশাসনকে অনেকবার জানিয়েছি। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির কারণে ড্রেজার বন্ধ করা যায়নি। এখনো দক্ষিণ দিকে ড্রেজার চলছে। নদীর তলদেশ থেকে মাটি তুলে নেওয়ার কারণেই ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে।’

ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোসা. নুরুন্নাহার বলেন, ‘আমার ঘরে যা কিছু ছিল সব নদীতে চলে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। স্থানীয়দের সাহায্যে কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল বের করতে পেরেছিলাম। হাঁস-মুরগিও নদীতে চলে গেছে। এখন আর কিছুই নেই।’

একই গ্রামের রহিমা বেগম বলেন, ‘রাত বারোটার দিকে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছিল। বড় বড় মাটির অংশ নদীতে ভেঙে পড়ছিল। সেই শব্দে ঘুম ভাঙে। কিছু সরানোর সুযোগ পাইনি। ছাগল, ঘর, দরজা সব নদী নিয়ে গেছে। শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি।’

নুরুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘এখন কোথায় যাব, কী করব তা আল্লাহই জানেন। আমাদের আর কিছুই রইল না। অনেকে ভয়ে ঘরবাড়ি খুলে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সেই সুযোগও পাইনি। চোখের সামনে সব নদীতে চলে গেল।’

এদিকে, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাদ্রাসার সামনে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি সাময়িক ব্যবস্থা। স্থায়ী নদীশাসন ছাড়া ভাঙন বন্ধ করা সম্ভব নয়।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এই চরটি সম্পূর্ণ বালুময়। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরের কোথাও শক্ত মাটির স্তর নেই। ফলে প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি থাকে।’

তিনি বলেন, ‘এই পুরো চরাঞ্চলকে টেকসইভাবে রক্ষা করতে হলে আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হবে। তারপর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হবে। আপাতত মাদ্রাসা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।’

যমুনার অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। দ্রুত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ, স্থায়ী নদীশাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দৌলতপুরের এই জনপদে সংকট আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!