মধ্যরাতে হঠাৎ পোড়া গন্ধে ঘুম ভাঙে বাড়ির লোকজনের। জানালা খুলতেই চোখে পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে দোচালা ঘর। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার। ছুটে আসেন প্রতিবেশীরা। সবাই মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ঘরের সবকিছু পুড়ে যায়। সেই আগুনের ঘটনাকে ঘিরেই এখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার রানিয়াদি গ্রাম।
প্রেম করে পরিবারের অমতে বিয়ে করায় ছেলের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেয়ের বাবার বিরুদ্ধে। তবে পুলিশের দাবি, ছেলের পরিবারের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাকে দুর্বল করতেই তারা নিজেরাই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
ঘটনাটি উপজেলার চালা ইউনিয়নের রানিয়াদি গ্রামে। বুধবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে একটি দোচালা ঘরে আগুন লাগে। স্থানীয়দের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ঘরের বিভিন্ন মালামাল পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৯ জুন রানিয়াদি গ্রামের মো. কুব্বতের ছেলে রনি একই গ্রামের মো. ফজলুল হোসেনের অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে ফাহিমা আক্তার মিমকে পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেন। এরপর থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ জুলাই মেয়ের বাবা হরিরামপুর থানায় রনিসহ তার পরিবারের আরও তিন সদস্যের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলার পর থেকেই ছেলের পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ছেলের পরিবারের অভিযোগ, ওই ঘটনার জের ধরেই বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে তাদের বাড়ির একটি দোচালা ঘরে আগুন দেওয়া হয়।
রনির চাচি মাজেদা বেগম বলেন, পোড়া গন্ধে আমার ঘুম ভেঙে যায়। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। প্রথমে বড় ভাতিজাকে ফোন করি, কিন্তু সে ফোন ধরেনি। পরে বাইরে বের হয়ে আশপাশের লোকজনকে ডাকলে সবাই মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি।
ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জালাল মোল্লা বলেন, এতদিন ধরে এলাকায় আছি, এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। রনি ও মিম পালিয়ে বিয়ে করার পরই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেদিন যদি বিদ্যুৎ থাকত, তাহলে আগুন ছড়িয়ে আরও অনেক বাড়িঘর পুড়ে যেতে পারত।
রনির চাচা মো. ওমর বলেন, আমি ঢাকায় চাকরি করি। বুধবার রাত প্রায় ১টার দিকে বাড়ি থেকে ফোন করে আগুন লাগার খবর জানানো হয়। খবর শোনার পর সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমাদের বাড়িতে ছোট ছোট শিশু রয়েছে। পরদিন থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ আমাকে বলে, ‘মেয়েটিকে দুই দিন আগে ফিরিয়ে দিলেই তো মামলা হতো না।’
তিনি আরও বলেন, আমার ভাতিজা বিয়ে করেছে, এতে আমাদের পরিবারের কী অপরাধ? এখন আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সরকারের কাছে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ। হরিরামপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক বলেন, ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকে নিয়ে ওই পরিবারের লোকজন থানায় এসেছিলেন। তবে তারা কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। শুধু ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কীভাবে আগুন লাগল জানতে চাইলে তারা বলেন, বিষয়টি তারা জানেন না। আমি তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো অভিযোগ দেননি।
হরিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন বলেন, ছেলের পরিবারের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। সেই মামলাকে হালকা করার উদ্দেশ্যে তারাই নিজেদের বাড়িতে আগুন দিয়ে থাকতে পারে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের অভিযোগ দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা অভিযোগ করেননি। অভিযোগ না করলেও পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করেছে এবং বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নোট করা হয়েছে।


