সাংবাদিকদের সমাজের দর্পণ বলা হয়। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি, অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা কিংবা জনদুর্ভোগের চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব তাদেরই। একইসঙ্গে সরকারের উন্নয়ন, সম্ভাবনা, সফলতা ও ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকেও জনগণের সামনে পৌঁছে দেন সংবাদকর্মীরা। একটি দায়িত্বশীল সংবাদ অনেক সময় এমন পরিবর্তনের সূচনা করে, যা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার বলয়ও করতে পারে না।প্রতী
তবে মফস্বল সাংবাদিকতা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এখানে সত্য প্রকাশের পথে প্রতিনিয়ত রয়েছে নানা বাধা, চাপ ও প্রতিকূলতার পরিবেশ। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট মহলের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদের তথ্য সংগ্রহের সময়ই চাপ দিয়ে নিউজ প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভালো কাজ নিয়ে প্রতিবেদন করলেও এক শ্রেণির মানুষ তড়িঘড়ি করে ‘দালাল’ তকমা লাগিয়ে দেন। যেন ভালো কাজের প্রশংসা করা অপরাধ, আর খারাপ কাজের সমালোচনা করাই সাংবাদিকতার একমাত্র দায়িত্ব।
মফস্বলের সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এখানে সবাই কমবেশি সবার পরিচিত। ফলে অনেকেই পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে এক করে ফেলেন। সংবাদ প্রকাশের পর সংবাদটির সত্যতা নিয়ে আলোচনা না হয়ে শুরু হয় সাংবাদিককে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ। কে কার আত্মীয়, কে কার বন্ধু, কে কার বিরোধী এসব বিষয়ই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে।
এছাড়া কিছু পেশার লোক আছেন, যারা সাংবাদিকতা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না থাকলেও নানা উপায়ে এ পেশায় তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চান। তারা অনেক সময় নিজেদের ‘প্রেসক্রিপশন’ চাপিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
তবে এর চেয়েও বর্তমানে বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হলো অপ-সাংবাদিকতার বিস্তার। বর্তমানে নামসর্বস্ব ও অখ্যাত কিছু অনলাইন বা গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে অনেকেই সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন অফিস, থানা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ঘনিষ্ঠতা এবং মাঠ-ময়দানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের অনেকের নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ, নেই সাংবাদিকতার ন্যূনতম নৈতিকতা সম্পর্কে ধারণা।
ফলে কোথাও তারা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ভয়ভীতি দেখান, কোথাও প্রভাব খাটান। আবার কোথাও নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, একজন ভুয়া বা অপেশাদার ব্যক্তির ভুলের দায় অনেক সময় পুরো সাংবাদিক সমাজকে বহন করতে হয়। সাধারণ মানুষ তখন প্রকৃত সাংবাদিক ও অপ-সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। ফলে মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর প্রকৃত সংবাদকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তবে এই দায় শুধু সাংবাদিকদের নয়। যারা সমাজে ভালো সাংবাদিকতা দেখতে চান, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো সংবাদকর্মী যখন একটি অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করেন, তখন তার ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি হয়। সেই মুহূর্তে সমাজের সচেতন মানুষদের উচিত সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ একজন সাংবাদিকের কলম তখন শুধু তার ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং পুরো সমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।
সাংবাদিকতার শক্তি কতটা কার্যকর হতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ আমরা দৌলতদিয়া ঘাটে দেখতে পেয়েছি। সম্প্রতি একটি দূরপাল্লার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরিঘাটের পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
কিন্তু কয়েক মাস আগেই একই ধরনের দুর্ঘটনায় একটি যাত্রীবাহী বাস একইভাবে নদীতে ডুবে গিয়ে বহু প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। এরপর সরকারপ্রধানের নির্দেশে ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা সবসময় কার্যকর হচ্ছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সহকর্মী বিএম খোরশেদ যমুনা টেলিভিশনে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনটি প্রচারের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং নিয়ম বাস্তবায়নে কঠোর হয়। তারই ফলাফল আমরা সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় দেখতে পেয়েছি। একটি সচেতন প্রতিবেদন হয়তো অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।
একইভাবে স্কুলপথে কিশোর গ্যাংয়ের কারণে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমার একটি সচিত্র প্রতিবেদন এবং মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণ বিষয়টি নিয়ে সচেতন হয়েছেন। অনেক জায়গায় প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একটি সংবাদ কেবল খবর নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী মাধ্যম।
বর্তমানে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ছড়াছড়ি, তখন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে হবে। আর অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সমালোচনা হোক তথ্যভিত্তিক, কিন্তু সত্য প্রকাশের দায় নেওয়া মানুষদের নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়।
মনে রাখতে হবে, একজন সাংবাদিকের কলম কেবল সংবাদ লেখে না। অনেক সময় সেটি মানুষের জীবন বাঁচায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই ভালো সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে একটি সচেতন, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনের পাশে দাঁড়ানো।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার একটি দায়িত্বশীল প্রয়াস। একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারে, তেমনি একটি ভালো উদ্যোগকে ছড়িয়ে দিয়ে সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকেও এগিয়ে নিতে পারে।
তাই ভালো সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ানো, সত্য প্রকাশে সহযোগিতা করা এবং অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ একটি সচেতন সমাজ গড়ে ওঠে তথ্যের ভিত্তিতে। আর সেই তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হলো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু থামিয়ে রাখা যায় না। আর সেই সত্যকে মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার নামই সাংবাদিকতা।


