সব গল্পের শেষটা সুন্দর হয় না। তবে কিছু গল্পের শেষ এমনভাবে লেখা থাকে, যা সময়ের সঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। ব্রাজিল ফুটবলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যটিও যেন ঠিক তেমনই এক প্রতীকী মুহূর্ত।
১৬ বছর আগে, স্বপ্নভরা চোখে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে প্রথমবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন এক কিশোর। সেদিনের সেই অভিষেক হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সময়ের স্রোতে সেই কিশোর হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, কোটি ভক্তের ভালোবাসার প্রতীক এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৬ বছর। অসংখ্য গোল, ট্রফি, উল্লাস, অশ্রু, ইনজুরি, প্রত্যাবর্তন আর বিতর্কে ভরা এক বর্ণিল পথচলার শেষ অধ্যায়ও লেখা হলো সেই একই স্টেডিয়ামে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল। স্বপ্ন ছিল ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার নাম। ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। সেটিই হয়ে থাকে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ গোল। শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠজুড়ে ছিল নিস্তব্ধতা। নেইমারের চোখে ছিল বিদায়ের আবেগ, আর কোটি সমর্থকের মনে অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস।
বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম তিনি লিখে গেছেন সোনালি অক্ষরে। জাতীয় দলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন তিনি। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৮টি গোল। ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জয়ে ছিলেন দলের অন্যতম নায়ক।
নেইমারের ক্যারিয়ার ছিল ঠিক তাঁর খেলার মতোই। কখনও ঝলমলে, কখনও কঠিন, কখনও সমালোচিত, আবার কখনও বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনের গল্প। প্রতিটি ইনজুরির পর তিনি ফিরেছেন নতুন করে। প্রতিটি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন নিজের পায়ের জাদুতে।
তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যটিও তাই যেন এক চলচ্চিত্রের শেষ ফ্রেম। যে মাঠে শুরু হয়েছিল স্বপ্নের যাত্রা, সেই মাঠেই শেষ হলো ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর অধ্যায়।
ফুটবলে এমন সমাপতন খুব কমই দেখা যায়। শুরু আর শেষ যখন একই ঠিকানায় এসে মিলে যায়, তখন সেটি শুধু একটি বিদায় নয়, ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে থাকে এক পূর্ণ বৃত্তের গল্প।
নেইমার হয়তো আর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামবেন না। কিন্তু তাঁর ড্রিবল, তাঁর হাসি, তাঁর উদযাপন আর কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া মুহূর্তগুলো বেঁচে থাকবে আরও বহু বছর।


