২০২০ সালের লকডাউনের সময় বিশ্বজুড়ে নৌপরিবহন কার্যত থমকে যায়। ফলে সমুদ্রে মানুষের সৃষ্ট শব্দদূষণ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় আর তখনই সমুদ্র ভরে ওঠে মাছের গান, কাঁকড়ার টোকাটুকি আর অজস্র প্রাণীর ধ্বনিতে।
ঝিরঝিরে কটকট, টুংটাং, টপটপ আর ক্লিক এগুলোই একটি সুস্থ পানির নিচের শব্দভূমির পরিচয়। “এই সব আলাদা আলাদা শব্দ মিলেই এক ধরনের অর্কেস্ট্রা তৈরি করে হাজারো যন্ত্র একসঙ্গে বাজছে,” বলেন ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী স্টিভ সিম্পসন।
দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভাবত সমুদ্র নীরব; পানির নিচে আমাদের কানে যা পৌঁছায়, তার সীমাবদ্ধতার কারণেই এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিংশ শতকের শুরুতে যখন সমুদ্রের শব্দ পর্যবেক্ষণে হাইড্রোফোন (পানির নিচের মাইক্রোফোন) ব্যবহার শুরু হয়, তখন জানা যায় সামুদ্রিক প্রাণীরা বিস্ময়কর শব্দ ব্যবহার করে।
মানুষের তৈরি শব্দ যত বেশি সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ছে, ততই প্রাণীদের যোগাযোগ, প্রজনন ও খাদ্যসংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ আচরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তাই ২০১০ সাল থেকেই বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন শব্দের প্রভাব বোঝার জন্য কীভাবে সমুদ্রকে কিছুটা নীরব করা যায়।
এরপর এল মহামারি আর বিশ্ব পেল এক বিরল নীরবতার সুযোগ।
নৌপরিবহন ও বাণিজ্যিক নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেলে, মানুষের কোলাহল ছাড়াই সমুদ্র কেমন শোনায় তা শোনার সুযোগ পেলেন বিজ্ঞানীরা। এই ‘নীরব বছর’ নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। জানার চেষ্টা চলছে, সমুদ্র যত জোরে শোনায়, তাতে সামুদ্রিক প্রাণীর কতটা ক্ষতি হয়।
সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ম্যামাল বায়োলজির অধ্যাপক পিটার টাইয়াক আন্তর্জাতিক ‘কোয়ায়েট ওশান এক্সপেরিমেন্ট’ (আইকিউওই) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, “এই উদ্যোগের মূল ভাবনা ছিল নতুন শব্দ যোগ করে কী হয় দেখার বদলে, কোথাও গিয়ে শব্দ কমালে কী ঘটে, তা দেখা।” কিন্তু বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের শব্দ কমানো যে ব্যয়বহুল ও জটিল তা স্পষ্ট ছিল।
২০২০ সালে কোভিড–১৯ সেই কাজটাই করে দিল। নৌপরিবহন ও পর্যটন থমকে যাওয়ায় বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য কমে যায় ৪.১ শতাংশ। কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চলে নৌযান চলাচল ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে। মডেলিং অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জাহাজের শব্দশক্তি কমেছিল প্রায় ৬ শতাংশ।
এর ফলে তৈরি হয় এক স্বাভাবিক বৈশ্বিক পরীক্ষাগার, যেখানে শব্দের প্রভাব বোঝার বিরল সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্বজুড়ে গবেষকরা লকডাউনের আগে, চলাকালীন সময় এবং পরে সমুদ্রের শব্দভূমি শুনেছেন বিশ্ব মহাসাগরে আগে থেকেই বসানো প্রায় ২০০টি হাইড্রোফোন ব্যবহার করে।
২৬ মার্চ ২০২০–এ নিউজিল্যান্ড লকডাউনে গেলে দেশটির ব্যস্ততম উপকূলীয় নৌপথ হাউরাকি গালফ মেরিন পার্কে নৌচলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে পানির নিচের শব্দ স্বাভাবিকের এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। ফলে মাছ ও ডলফিনের যোগাযোগের পরিসর বেড়ে যায় সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত। ডলফিনের ক্ষেত্রে এর মানে তাদের ডাক জাহাজের শব্দে বাধাগ্রস্ত না হয়ে প্রায় এক মাইল (১.৫ কিলোমিটার) বেশি দূরে পৌঁছাতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের গবেষক মাইলস পারসনস বলেন, “সমুদ্রে অধিকাংশ প্রাণীর জন্য শব্দই প্রধান যোগাযোগমাধ্যম।” সমুদ্র নিজেই এক কোলাহলপূর্ণ জায়গা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রে থাকা আনুমানিক ৩৪ হাজার মাছের প্রজাতির মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই শব্দ উৎপাদন করে।
“শব্দ ব্যবহার হয় যোগাযোগ, খাদ্য খোঁজা, প্রজনন, এলাকা রক্ষা নানান কাজে এবং অনেক দূরত্বজুড়ে,” বলেন পারসনস। কিছু প্রাণী, যেমন তিমি, সমুদ্রের ‘ডিপ সাউন্ড চ্যানেল’ নামে পরিচিত একটি অনুভূমিক স্তরে কাজ করে যেখানে শব্দ হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে।
অন্যদিকে, স্ন্যাপিং শ্রিম্পের মতো প্রাণীরা অগভীর জলে যোগাযোগ করে। তারা দ্রুত চিমটি বন্ধ করে ‘স্ন্যাপ’ শব্দ তৈরি করে—একটি বুদবুদ সৃষ্টি হয়, যা ভেঙে শব্দ করে শিকার অবশ করতে ও শত্রু তাড়াতে সাহায্য করে। এই শব্দের তীব্রতা ২১০ ডেসিবেলেরও বেশি হতে পারে সমুদ্রের সবচেয়ে জোরে শোনা শব্দগুলোর একটি, অথচ উৎপাদনকারী প্রাণীটি আকারে খুবই ছোট। “এটা যেন পানির নিচে বন্দুকের গুলির মতো,” বলেন পারসনস।
কিন্তু সমুদ্র দিন দিন আরও শব্দমুখর হচ্ছে মানুষের সৃষ্ট শব্দ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ভূ-ভৌত শব্দ, যেমন ঝড় বা বরফ গলার আওয়াজ, যোগ হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে মূলত বৈশ্বিক নৌপরিবহন বৃদ্ধির কারণে মানুষের তৈরি শব্দ বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোগ্যপণ্য বিশাল কনটেইনার জাহাজে করে সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয় দিনরাত অবিরাম।
এর পাশাপাশি, অবক্ষয়গ্রস্ত ও দুর্বলভাবে ব্যবস্থাপিত সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র প্রাণীদের শব্দভূমিও বদলে দিয়েছে। কেল্প বন ও প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস, হিমবাহ গলা, অতিমাত্রায় মাছ ধরা ও পানির নিচে খননের ফলে বহু প্রাণীর আবাস নষ্ট হয়েছে ফলে শব্দ উৎপাদনকারী প্রাণীর সংখ্যাও কমছে।
সিম্পসনের মতে, শিল্পপূর্ব যুগের তুলনায় আজকের সমুদ্রের শব্দ একেবারেই আলাদা। “আগে সমুদ্রের শব্দভূমি গঠিত হতো জীবজ ধ্বনি—প্রাণীর শব্দ—এবং ভূজ ধ্বনি—বৃষ্টি, বাতাস, স্রোতের শব্দ—দিয়ে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি শব্দ, যেমন প্রবালপ্রাচীরের ওপর মোটরবোটের আওয়াজ।”
জাহাজ বা নির্মাণকাজ থেকে আসা মানুষের শব্দ প্রাণীদের শব্দ ঢেকে দিতে পারে ফলে তারা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। “এটা যেন একটা বারের মতো,” বলেন পারসনস। “বারে কেউ না থাকলে বন্ধুর কথা শোনা যায়; ভিড় বাড়লে শোনার দূরত্ব কমে যায়।”
শব্দের তীব্রতা বা কম্পাঙ্কই শুধু নয়, এর অনিয়মিত উপস্থিতিও সমস্যাজনক। “আমরা শহরে থাকলে ট্রাফিকের শব্দে অভ্যস্ত। কিন্তু সমুদ্রে হঠাৎ একটা নৌকা মাথার ওপর দিয়ে গেলে প্রাণীরা তা আশা করে না,” বলেন সিম্পসন।
কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে দেখা গেছে, প্রজনন মৌসুমে জাহাজের শব্দ বাড়লে হামব্যাক তিমি কম গভীরে ও কম ঘনঘন সমুদ্রতল থেকে খাবার সংগ্রহ করে।
অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণায় দেখা যায়, অভিবাসী হামব্যাক তিমিরা নৌযান কাছে এলে বেশি সময় পানির নিচে থাকে এবং ডুবের সময় বাড়ায়। বাচ্চাসহ দলগুলো নৌযানের উপস্থিতিতে আরও বেশি সংবেদনশীল। তিমি পর্যবেক্ষণ নৌকা কাছে এলে মা ও বাচ্চা সাউদার্ন রাইট তিমির বিশ্রামের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এ ছাড়া, সামরিক সোনার পানির নিচের বস্তু শনাক্তে ব্যবহৃত শব্দতরঙ্গ প্রযুক্তি তিমির তীরভূমিতে আটকে পড়ার সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণ মিলেছে। এমন ঘটনায় আক্রান্ত বিকড তিমিদের শরীরে ‘বাবল লেশন’সহ ডিকমপ্রেশন অসুস্থতার মতো লক্ষণ, কান ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং শ্রবণক্ষমতা ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
মানুষের মতোই, অতিরিক্ত শব্দ তিমির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ আয়ু কমাতে ও মাছের প্রজনন সাফল্য হ্রাস করতে পারে, বলেন পারসনস।
প্রবালপ্রাচীরে শব্দ দূষণ বাসা বাঁধা মাছের ওপরও প্রভাব ফেলে চাপ বাড়ায়, ডিমের যত্ন কমায় এবং শিকারি–শিকার সম্পর্কের সংকেত ঢেকে দেয়। অ্যাম্বন ড্যামসেলফিশ নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে, মোটরবোটের শব্দে পুরুষ মাছ বেশি সতর্ক হয়ে পড়ে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে তারা নীরব পরিবেশের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি নজরদারি করে এবং ১৭ শতাংশ বেশি সময় সতর্ক অবস্থায় থাকে।
গবেষণাটি দেখিয়েছে, মোটরবোটের শব্দ অভিভাবকসুলভ আচরণের নানা দিককে ক্ষতিগ্রস্ত করে খাদ্য জোগান কমে, সন্তানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হ্রাস পায় এবং প্রতিরক্ষামূলক আচরণ বদলে যায়।
২০২০ সালে নিউজিল্যান্ডে নৌচলাচল বন্ধের সময় আইকিউওই–এর আওতায় সংগৃহীত তথ্য বলছে, নৌযান চলাচলে সামান্য পরিবর্তনও পানির নিচের শব্দে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে বোঝা যায় বড় জাহাজের পাশাপাশি ছোট নৌযানের শব্দও সামুদ্রিক প্রাণীদের শ্রবণ ও যোগাযোগ সীমিত করে।
তবে শব্দের ব্যবহার বোঝার মধ্য দিয়ে সমুদ্র পুনরুদ্ধারের এক নতুন পথও খুলেছে। সুস্থ প্রবালপ্রাচীরের শব্দ রেকর্ড করে পানির নিচে স্পিকারের মাধ্যমে বাজালে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ফিরে আসে পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হয়। “আমরা যেন বলে দিই এগুলো সমৃদ্ধ পাড়া,” বলেন সিম্পসন।
আইকিউওই–এর একটি ফলাফল হলো ‘ওয়ার্ল্ড ওশান প্যাসিভ অ্যাকুস্টিক্স মনিটরিং (ওপ্যাম)’ দিবসের সূচনা। পারসনস ও সিম্পসনের উদ্যোগে ৮ জুন ২০২৩ থেকে এ দিনটি পালিত হচ্ছে। লন্ডনের খাল থেকে ফ্রান্সের পুকুর বিশ্বজুড়ে পানির নিচের শব্দ রেকর্ড করা হয়।
“অনেক ভালো ধারণার মতোই, ওপ্যামের শুরু হয়েছিল জার্মানির এক সম্মেলনে মাইলসের সঙ্গে বিয়ার খেতে খেতে,” বলেন সিম্পসন। “আমরা ডাক দিয়েছিলাম ভাবিনি এত সাড়া পাব। ২০২৩ সালে শত শত মানুষ সারা বিশ্ব থেকে তাদের রেকর্ডিং শেয়ার করেছেন কেন তারা এই গবেষণা করেন, কী খুঁজে পাচ্ছেন, আর সমুদ্র শোনার আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন।”
বিবিসি


