বৈধ বিনিয়োগেই কমতে পারে আয়কর

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী পরিকল্পিত কর ব্যবস্থাপনা বা ট্যাক্স প্ল্যানিং কোনো কর ফাঁকি নয়, বরং এটি আইনের মধ্য থেকেই করদাতার সর্বনিম্ন করদায় নিশ্চিত করার একটি বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

কোরবানির ঈদের পরপরই শেষ হতে যাচ্ছে ২০২৫-২৬ আয়বর্ষ। আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই একজন করদাতা চাইলে বৈধ বিনিয়োগ ও অনুমোদিত ব্যয়ের মাধ্যমে তার করদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারেন। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী পরিকল্পিত কর ব্যবস্থাপনা বা ট্যাক্স প্ল্যানিং কোনো কর ফাঁকি নয়, বরং এটি আইনের মধ্য থেকেই করদাতার সর্বনিম্ন করদায় নিশ্চিত করার একটি বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

বাংলাদেশে এখনো অনেক করদাতা বছরের শেষে হঠাৎ করেই কর হিসাব করতে বসেন। ফলে অনেকেই কর রেয়াতের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করতে পারেন না। অথচ সামান্য সচেতনতা ও সময়মতো বিনিয়োগ একজন করদাতাকে বড় ধরনের কর সুবিধা এনে দিতে পারে।

বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী স্বাভাবিক পুরুষ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের জন্য এ সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী করদাতার জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের জন্য এ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এছাড়া যেসব করদাতার উপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তারা প্রতি সন্তানের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত সুবিধা পাবেন। তবে পিতা-মাতা উভয়েই করদাতা হলে এ সুবিধা কেবল একজন গ্রহণ করতে পারবেন।

আয়কর আইন ২০২৩ অনুসারে একজন ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা কর রেয়াত পাবেন তিনটি সীমার মধ্যে যেটি সর্বনিম্ন হবে তার ভিত্তিতে। এগুলো হলো:

* করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ
* প্রকৃত অনুমোদিত বিনিয়োগ ও ব্যয়ের ১৫ শতাংশ
* অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা

অর্থাৎ, করদাতা যত বেশি পরিকল্পিত ও অনুমোদিত বিনিয়োগ করবেন, তত বেশি কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেটি অবশ্যই আইনে অনুমোদিত খাতে হতে হবে।

আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিলের তৃতীয় অংশে কর রেয়াতযোগ্য বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ব্যয়ের খাত উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। একজন করদাতা আয়বর্ষে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের বিপরীতে কর রেয়াত সুবিধা পেতে পারেন। এটি একদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ, অন্যদিকে কর সুবিধাও নিশ্চিত করে।

ডিপিএস বা ডিপোজিট পেনশন স্কিমও বর্তমানে কর পরিকল্পনার একটি কার্যকর মাধ্যম। তফসিলি ব্যাংকে করা ডিপিএসের বিপরীতে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ কর রেয়াতের আওতায় আসে।

জীবন বীমা পলিসিও কর রেয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তবে এক্ষেত্রে বাৎসরিক প্রিমিয়াম এবং জীবন বীমা পলিসির মোট মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ অর্থ কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্যও রয়েছে কর সুবিধা। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে একজন করদাতা কর রেয়াত সুবিধা নিতে পারেন। এতে যেমন বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ সৃষ্টির সুযোগও তৈরি হয়।

এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানে স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ড রয়েছে, সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জমাকৃত অর্থও কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়।

শুধু বিনিয়োগ নয়, কিছু নির্দিষ্ট খাতে দান ও ব্যয়ের মাধ্যমেও কর রেয়াত পাওয়া যায়। যেমন যাকাত তহবিলে দান, আইসিডিডিআরবি, সিআরপি সাভার, এশিয়াটিক সোসাইটি কিংবা আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে অনুদান প্রদান করলেও কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এতে সমাজকল্যাণমূলক কাজ যেমন উৎসাহিত হয়, তেমনি করদাতাও আর্থিকভাবে উপকৃত হন।

বর্তমানে অনেক করদাতা কর ব্যবস্থাপনাকে জটিল মনে করলেও বাস্তবে এটি একটি পরিকল্পিত আর্থিক সিদ্ধান্তের বিষয়। বছরের শেষ সময়ে এসে তড়িঘড়ি না করে যদি শুরু থেকেই বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তাহলে করের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর রেয়াতের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করার সময় শুধু কর সুবিধা নয়, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ মুনাফা এবং তারল্য বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। কারণ শুধুমাত্র কর বাঁচানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই করদাতাদের উচিত ৩০ জুনের আগেই নিজেদের আয়, ব্যয় ও বিনিয়োগের হিসাব পর্যালোচনা করে অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ সম্পন্ন করা। সঠিক কর পরিকল্পনা একজন নাগরিককে যেমন আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী করে তোলে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল কর সংস্কৃতিও গড়ে তোলে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!