তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার জনজীবন। চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় দিন-রাতজুড়ে লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের চিত্র। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন যেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তেমনি স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও পরিবহন খাতেও পড়েছে মারাত্মক প্রভাব।
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ফিডারের মাধ্যমে ৪৪ হাজার ৭৯৭ জন গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ মিলছে ছয় মেগাওয়াটেরও কম। এই ঘাটতি সামাল দিতে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর তিনটি ফিডার বন্ধ রেখে বাকি তিনটি চালু রাখা হচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১৪ থেকে ১৫ বার লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।
চলমান তাপদাহের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে অসহনীয়। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের বাসিন্দা সাজিদা রহমান বলেন, ‘দিনে গরম, রাতে আবার বিদ্যুৎ থাকে না। বাচ্চারা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। আমরা নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এমন অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন চাই।
উপজেলার গোপালপুর বাসিন্দা মো. মিঠু মিয়া বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে ঘরে থাকা যায় না। এটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক জীবন না। ছোট বাচ্চা কান্না করে। চার্জার ফ্যানের ব্যাকআপও শেষ হয়ে যায়। এমন দুর্ভোগ আগে এতো পরিমান হয়নি।’
লোডশেডিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিকল্প বিদ্যুৎ সরঞ্জামের চাহিদা। চার্জার ফ্যান, আইপিএস ও ব্যাটারির দোকানগুলোতে এখন ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
সাটুরিয়া বাজারের সোহেল ইলেকট্রনিক্সের মালিক সোহেল জানান, ‘দুই সপ্তাহ আগেও যেখানে দিনে ১০-১৫টা চার্জার ফ্যান বিক্রি হতো, এখন প্রতিদিন ৪০-৫০টা বিক্রি হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে প্রচুর পরিমানে লোডশেডিং হচ্ছে এলাকায়। মানুষ গরমে বাধ্য হয়ে ফ্যান কিনছেন। ফ্যানের পাশাপাশি আইপিএস বিক্রিও বাড়ছে।’
বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবায়। সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীরা বিছানা ছেড়ে বারান্দায় আশ্রয় নিচ্ছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন আলমাস হোসেন বলেন, ‘তিন তলায় এত গরম যে বিদ্যুৎ না থাকলে থাকা যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে বসে থাকতে হয়। বিদ্যুত না থাকার কারণে আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন রোগীরা।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মামুন উর রশিদ বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের রোগীরা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। প্যাথলজি, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও টেলিমেডিসিন সেবা ব্যাহত হচ্ছে। নেবুলাইজার, ইসিজি ও জরুরি পরীক্ষাগুলোও অনেক সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একটি হাই ভোল্টেজ জেনারেটর থাকলেও তেলের অভাব ও বাজেট না থাকায় সেটি চালানো যাচ্ছে না।’
রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বাড়ছে চুরি-ডাকাতির ঘটনাও। অন্ধকারের সুযোগ নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার বাসিন্দা রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। আর প্রতিদিন রাতে বেশ কয়েকবার বিদ্যুত চলে যায়। আর অনেকক্ষন পর আসে। তাই গবাদিপশুসহ অন্যান্য চুরি ঠেকাতে প্রতিরাতেই পাহারা দিতে হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ওপরও। ঠিকমতো চার্জ না হওয়ায় সড়কে কমে গেছে হ্যালোবাইক ও ইজিবাইক।
হ্যালোবাইক চালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি ফুল চার্জ হয় না। দুই-তিনটা ট্রিপ দিলেই গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। আগে ৭০০-৮০০ টাকা আয় হতো, এখন ২০০-৩০০ টাকার বেশি করতে পারি না চার্জের জন্য। আমার মতো অনেক চালকই এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে সেচ পাম্প চালানো যায় না। আমাদের এলাকার অধিকাংশ সেচ পাম্প বিদ্যুত চালিত। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় আছে।’
সাটুরিয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের উপব্যবস্থাপক ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। তার ওপর গত দুই সপ্তাহ ধরে তাপদাহ বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। এই কারণে লোডশেডিং বাড়ছে।’
জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ, এবং হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


