দেড় দশকে হয়নি সেতু সংস্কার, বর্ষা এলেই বাড়ে আতঙ্ক

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কুস্তা পূর্বপাড়ায় ইছামতি নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভগ্নপ্রায় সেতু এখন এলাকাবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে সেতুটির একাংশ নদীগর্ভে বিলীন, আর অবশিষ্ট অংশও নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ। সামনে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় স্থানীয়দের শঙ্কা এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় জানায়, ২০০২ সালে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সেতুটি নির্মাণ করে। তবে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই নদী ভাঙন ও বর্ষার তীব্র স্রোতে সেতুর একপাশ ধসে পড়ে। বর্তমানে সেতুর এক-তৃতীয়াংশ কংক্রিটের অংশ টিকে থাকলেও বাকি দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে গ্রামবাসী নিজেরাই বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর কংক্রিটের অংশে রেলিং ভাঙা, মাঝের অংশ দুলছে। এর ওপর দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে শত শত মানুষ। সেতুর অপর অংশে বাঁশের সাঁকোই একমাত্র ভরসা। বিশেষ করে বর্ষা এলে সাঁকো ভিজে পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, তীব্র স্রোতের কারণে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এই সেতুর একপাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঘিওর বাজার ও কুস্তা বন্দর, অন্যপাশে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা। প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১২ গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ব্যবহার করে যাতায়াত করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস আলী খান বলেন, ‘এই সেতু দিয়ে কুস্তা, ঠাকুরকান্দি, ভররা, বিনোদপুর, খলসী, কুমুরিয়া, বনগাঁও, নারচি ও জিয়নপুরসহ অন্তত ১০-১২ গ্রামের মানুষ প্রতিদিন চলাচল করে। ঝুকি থাকার পরও সময় কম লাগে বলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পার হন।’

কুস্তা বন্দর জামে মসজিদের খাদেম ওমর আলী জানান, ‘দেড় দশক ধরে আমরা এই দুর্ভোগ সহ্য করছি। বৃষ্টির দিনে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে গেলে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। নামাজ পড়তে আসতেও কষ্ট হয়। আর যারা বয়স্ক আর বাচ্চা তাদের কষ্ট আরো বেশি। এদিকে সেদিক হলেই নদীতে পড়ে যেতে হবে।’

ঘিওর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাবন্য আকতার জানায়, ‘সেতু পার হতে খুব ভয় লাগে। কারণ যে অংশ বাঁশ দিয়ে তৈরি সে অংশটাই বেশি সমস্যা। স্কুলের সময় হয়ে যায় তারাতারি যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ওই বাঁশে কারো না কারো পা আটকে যায়। বৃষ্টি হলে অবস্থা আরও খারাপ হয়। তখন অনেকেই স্কুলে যেতে পারে না, পরীক্ষার সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।”

অভিভাবক সবিতা রানী বলেন, ‘এই কয়েকদিন কষ্ট হলেও সমস্যা হয়নি। যখন বৃষ্টি আর বর্ষা শুরু হয় তখন অনেক ভয় হয়। পা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর বর্ষার পানির স্রোতে সাকোটা প্রচুর দুলতে থাকে। আমার ছোট ছেলেকে কোলে করে এই সাঁকো পার হতে হয়। একটু ভুল হলেই নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। অন্য পথ দিয়ে স্কুলে যেতে হলে আধা কিলোমিটার ঘুরতে হয়। তাই সহজ যাতায়াতের জন্য এখান দিয়ে চলাচল করি।’

বৃদ্ধ শামসুর রহমান বলেন, ‘এই বয়সে সাঁকো পার হওয়া মানেই জীবন হাতে নিয়ে চলা। তবুও প্রয়োজনের তাগিদে যেতে হয়। কত জনপ্রতিনিধি এলেন-গেলেন, কিন্তু সেতুর আর কোনো উন্নতি হলো না। আমার চাই এতোগুলো মানুষ এখান দিয়ে যাতায়াত করেন। আমরা চাই নতুন সরকার আমাদের জন্য নতুন করে সড়ক নির্মাণ করুক।’

উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাহীনুজ্জামান জানান, ‘প্রায় পাঁচ বছর আগে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সেতু পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। নদী ভাঙনের ফলে একপাশে সেতুর এপ্রোচ সড়কের অভাবে কাজটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করে প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ না হলে আসন্ন বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!