ভ্রমণ মানেই শুধু নতুন কোনো জায়গা দেখা নয়, বরং নতুন মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। এবার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে হুট করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম পাবনার উদ্দেশ্যে। দুই দিন এক রাতের এই সফরে ছিল নদী পারাপারের রোমাঞ্চ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের স্মৃতি-বিজড়িত বাড়ি এবং সৎসঙ্গ আশ্রমের অনন্য আতিথেয়তা।
যাত্রার শুরু: ভোর ছয়টার মধ্যেই ছেলে অর্ণব ও তার মা ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হয়ে যায়। সকাল সাতটায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাসে আরিচাঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হই। মাত্র ত্রিশ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছে যাই ঘাটে।
প্রথম পরিকল্পনা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে ট্রলারে করে যমুনা নদী পাড়ি দেওয়ার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে স্পিডবোটে চড়ে বসি। যমুনার বুক চিরে ছুটে চলা স্পিডবোটের সেই পঁচিশ মিনিট ছিল পুরো সফরের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ। অল্প সময়েই পৌঁছে যাই কাজীরহাট ঘাটে।

পাবনার পথে: কাজীরহাটে নেমে কম খরচে পাবনা যাওয়ার জন্য বাস খুঁজলেও পাওয়া গেল না। তাই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় কাশিনাথপুর হয়ে পাবনা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাই পাবনায়।
ভ্রমণের শুরুতেই দরকার ছিল একটি ভালো নাস্তা। তাই শহরের প্যারাডাইস মোড়ে গিয়ে গরম গরম বড় আকারের লুচি-পরোটা, সবজি ও ডাল দিয়ে সকালের খাবার সারি। ভিড়ের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে খেলেও স্বাদ ছিল অসাধারণ। এরপর পাবনার বিখ্যাত প্যারাডাইস ও বনলতা সুইটসের মিষ্টির স্বাদ নিয়ে যেন ভ্রমণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পন্ন হলো।
ঈশ্বরদী ও রূপপুরের পথে: পাবনা থেকে সিএনজিতে ঈশ্বরদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। পথের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ প্রকৃতি আর জনপদের জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই ঈশ্বরদীতে।
প্রথমে ঘুরে দেখি ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন। এরপর রিজার্ভ অটোরিকশায় রওনা দিই দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে। পথে বিশাল বিশাল লিচুবাগান যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়। এক জায়গায় থেমে তাজা লিচুর স্বাদও নেওয়া হলো।

নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরাসরি ছবি বা ভিডিও ধারণের সুযোগ নেই। তাই দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবুও দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কাছ থেকে দেখার অনুভূতি ছিল অন্যরকম।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সৌন্দর্য: রূপপুর থেকে যাত্রা করি পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই সেতু আজও বিস্ময় জাগায়। ঈদের পরের সময় হওয়ায় ব্রিজের নিচে ছোট্ট মেলা বসেছিল। সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ানো, পাঁপড় খাওয়া আর ঠান্ডা পানীয় পান করে কাটে দুপুরের একটি অংশ।
পাবনার বিখ্যাত সর-দই: দুপুরের খাবারের জন্য ভালো রেস্টুরেন্ট খুঁজতে গিয়ে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ঈদ-পরবর্তী সময় হওয়ায় অনেক রেস্টুরেন্ট তখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, পাবনার বিখ্যাত সর-দই আর ছানার মিষ্টি দিয়েই দুপুরের ক্ষুধা মেটানো হবে। ভিড়ের কারণে বসার জায়গা না পেয়ে দোকানের পাশেই দাঁড়িয়ে মিষ্টি খেতে হয়। তবে স্বাদে কোনো কমতি ছিল না।
মানসিক হাসপাতাল ও সৎসঙ্গ আশ্রম: এরপর যাই পাবনার ঐতিহ্যবাহী মানসিক হাসপাতালে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কিছু সময় হাসপাতালের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাসপাতালটি কাজ করে যাচ্ছে।
বিকেলের দিকে পৌঁছে যাই ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আশ্রমে। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই আশ্রমের পরিবেশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে স্বাগত জানানো হয়। সিদ্ধান্ত নিই, রাতটা এখানেই কাটানো হবে।

রাতে আশ্রমের ভোজনালয়ে শত শত মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল স্মরণীয়। ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুগ ডাল আর লাবড়া সবজির সাধারণ মেনুতেও ছিল অসাধারণ স্বাদ। রাতের আলোয় আলোকিত আশ্রম আর প্রার্থনার পরিবেশ যেন এক অন্য জগতের অনুভূতি এনে দেয়।
সুচিত্রা সেনের স্মৃতির খোঁজে: পরদিন সকালে আশ্রমের সুস্বাদু খিচুড়ি নাস্তা শেষে বেরিয়ে পড়ি মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ির উদ্দেশ্যে।বর্তমানে বাড়িটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। ড্রয়িংরুমে চলছিল সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রের অংশবিশেষ। বিভিন্ন কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে তার স্মৃতিচিহ্ন। চারপাশের ফুলে ভরা বাগান আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
জোড় বাংলা মন্দির ও তাড়াশ রাজবাড়ী: এরপর যাই ঐতিহাসিক জোড় বাংলা মন্দিরে। মন্দিরের টেরাকোটার কারুকাজ অনেকটা দিনাজপুরের কান্তজী মন্দিরের কথা মনে করিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় বাইরে থেকেই দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
পরবর্তী গন্তব্য ছিল তাড়াশ রাজবাড়ী। প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো এই স্থাপনাটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। আনসার সদস্যদের অনুমতি নিয়ে কিছুক্ষণ ভেতরে ঘুরে দেখা যায়। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, পুরোনো দালানকোঠা এবং পরিচ্ছন্ন বাগান রাজবাড়ীটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ফেরার পালা: দুপুরের আগেই শুরু হয় ফেরার যাত্রা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিকেলে পৌঁছে যাই আরিচা ঘাটে। এরপর পাটুরিয়া ঘাটের পদ্মা রিভার ভিউ রেস্টুরেন্টে বিলম্বিত মধ্যাহ্নভোজ সেরে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসি মানিকগঞ্জে।
শেষকথা: মাত্র দুই দিন এক রাতের এই সফরে পাবনার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, স্থাপত্য ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য রূপ দেখার সুযোগ হয়েছে। রূপপুরের আধুনিকতা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঐতিহ্য, সুচিত্রা সেনের স্মৃতি আর সৎসঙ্গ আশ্রমের শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে এই ভ্রমণ দীর্ঘদিন স্মৃতিতে রয়ে যাবে।
কখনো কখনো দীর্ঘ ছুটির প্রয়োজন হয় না। সামান্য সময় আর একটু ইচ্ছাই যথেষ্ট। আর সেই ইচ্ছাই আমাদের নিয়ে গিয়েছিল পদ্মা-যমুনার ওপারে, এক অন্যরকম পাবনায়।


