মেসিদের তেল আর নেইমারদের চিনি ছাড়া উপায় নাই

বাংলাদেশের রান্নাঘরে প্রতিদিনই যেন ল্যাটিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তির আরেকটি ‘সুপার ক্লাসিকো’ অনুষ্ঠিত হয়। পার্থক্য শুধু একটাই—এখানে গোলের হিসাব হয় না, হিসাব হয় ডলারে; আর দর্শক গ্যালারিতে নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি রান্নাঘরে।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মানেই ফুটবল আবেগের দুই মেরু। বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকা এলেই দেয়ালে রঙের যুদ্ধ, ছাদে পতাকার প্রতিযোগিতা, আর চায়ের দোকানে যুক্তির চেয়ে আবেগের গোল বেশি হয়। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দার সেই দ্বৈরথের বাইরে আরও একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে বাংলাদেশের আমদানি বাজারে।

মজার বিষয় হলো, একজন ব্রাজিল সমর্থক সকালে যে পরোটা ভাজছেন, তার তেল হয়তো এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে; আর পাশে যে চায়ে চিনি দিচ্ছেন, সেটি এসেছে ব্রাজিল থেকে। অর্থাৎ, রান্নাঘরে দুই দলেরই নিয়মিত ‘একাদশ’ খেলছে।

রান্নাঘরের রাজা আর্জেন্টিনা

ফুটবলে আর্জেন্টিনা তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তবে বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজারে তারা যেন বহু বছরের অপরাজিত লিগ চ্যাম্পিয়ন।

২০২৫ সালের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী—

  • বাংলাদেশে আমদানি হওয়া অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের প্রায় ৫১ শতাংশ এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে।
  • শুধুমাত্র অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির মূল্য ৪৮ কোটি মার্কিন ডলার
  • এছাড়া দেশটি থেকে আমদানি হয় সয়াকেক, ভুট্টা ও গম—যা পশুখাদ্য, পোলট্রি এবং খাদ্যশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
  • সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির পরিমাণ ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার
  • বাংলাদেশের আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ১৭তম

অর্থাৎ, ফুটবল মাঠে যতই ব্রাজিলের সমর্থক বেশি থাকুক, রান্নাঘরের কড়াইয়ে কিন্তু আর্জেন্টিনার আধিপত্যই বেশি দেখা যায়।

চিনির সাম্রাজ্যে ব্রাজিলের একক আধিপত্য

তবে আর্জেন্টিনার এই স্বস্তি বেশি দূর যায় না। কারণ চায়ের কাপে, মিষ্টির দোকানে কিংবা উৎসবের পায়েসে ব্রাজিল কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে।

বাংলাদেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টন। এর মধ্যে—

  • ৯০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে।
  • সেই আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস ব্রাজিল।
  • বাংলাদেশের চিনির বাজারের ৬৫ শতাংশেরও বেশি দখলে ব্রাজিল।
  • ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে দেশের রিফাইনারিগুলো তা পরিশোধন করে বাজারজাত করে।

অর্থাৎ, সকালে চায়ের কাপে যে এক চামচ চিনি পড়ছে, তার ‘পাসপোর্ট’ ব্রাজিলের হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

অর্থনীতির স্কোরবোর্ডে কে এগিয়ে?

সয়াবিন তেলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিক বাণিজ্যে ব্রাজিল অনেক বড় ব্যবধানে এগিয়ে।

২০২৫ সালের হিসাবে—

সূচক আর্জেন্টিনা ব্রাজিল
বাংলাদেশের মোট আমদানি ৭৮ কোটি ডলার আর্জেন্টিনার প্রায় তিনগুণ
প্রধান রপ্তানি পণ্য সয়াবিন তেল, সয়াকেক, ভুট্টা, গম অপরিশোধিত চিনি
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি ২ কোটি ১৬ লাখ ডলার ১৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার
প্রধান বাংলাদেশি রপ্তানি তৈরি পোশাক তৈরি পোশাক

অর্থাৎ, সামগ্রিক বাণিজ্যে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যে আর্জেন্টিনা এখনো বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরতার নাম।

জনসংখ্যা ও আয়তনের বৈপরীত্য

দুই ল্যাটিন আমেরিকান দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্যও বেশ চমকপ্রদ।

দেশ আয়তন জনসংখ্যা
বাংলাদেশ ৫৬ হাজার বর্গমাইল প্রায় ১৮ কোটি
আর্জেন্টিনা ১১ লাখ বর্গমাইল প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ
ব্রাজিল ৩২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গমাইল প্রায় ২১ কোটি ৩৫ লাখ

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার বিশাল বাজার হওয়ায় খাদ্যপণ্যের জন্য এটি দুই দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

ফুটবলের বাইরে আরেক সুপার ক্লাসিকো

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মেসি-নেইমার কিংবা বিশ্বকাপ ট্রফির হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিনের বাজারেও চলছে আরেকটি নীরব লড়াই।

  • সয়াবিন তেলের গোলদাতা আর্জেন্টিনা।
  • চিনির সম্রাট ব্রাজিল।
  • মোট বাণিজ্যের স্কোরবোর্ডে এগিয়ে ব্রাজিল।
  • নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্যের বাজারে শক্ত অবস্থানে আর্জেন্টিনা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের রান্নাঘরে প্রতিদিনই যেন ল্যাটিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তির আরেকটি ‘সুপার ক্লাসিকো’ অনুষ্ঠিত হয়। পার্থক্য শুধু একটাই—এখানে গোলের হিসাব হয় না, হিসাব হয় ডলারে; আর দর্শক গ্যালারিতে নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি রান্নাঘরে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ

error: Content is protected !!